
শিরীষ: বিষ ও অ্যালার্জির প্রাকৃতিক ওষুধ
বিশেষজ্ঞ পর্যালোচিত
AyurvedicUpchar সম্পাদকীয় দল দ্বারা পর্যালোচিত
আয়ুর্বেদে শিরীষ কী?
শিরীষ (Albizia lebbeck) হলো আয়ুর্বেদের একটি শক্তিশালী ভেষজ উদ্ভিদ, যা মূলত বিষক্রিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং চামড়ের অ্যালার্জি দূর করতে ব্যবহৃত হয়। একে 'বহুনিঃশ্বাস বৃক্ষ'ও বলা হয় কারণ বাতাসে এর পাতাগুলো খুব শব্দ করে নড়ে। এই গাছের ছাল আর পাতা রক্ত শুদ্ধ করে এবং শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বা 'বিষ' নিষ্কাশনে জাদুর মতো কাজ করে।
সিনথেটিক অ্যান্টিহিস্টামিন খেলে অনেক সময় ঝিমুনি ভাব আসে, কিন্তু শিরীষ রক্ত পরিষ্কার করে (রক্ত শোধক) এবং মূল থেকেই বিষের প্রভাব কমায়। চরক সংহিতার 'সূত্র স্থানে' শিরীষকে 'দশমণি বিষমার্ণ' গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মানে হলো, এটি শরীরে ছড়িয়ে পড়া বিষ বা বিষাক্ত প্রতিক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারে।
গ্রামের বুড়োরা মৌমাছি বা পোকার কামড়ে শিরীষ পাতা বেটে লাগাতেন। আবার দীর্ঘদিনের অ্যালার্জি বা কাশিতে এর ছালের কাথ খেতে বলতেন। এর স্বাদ তেতো (তিক্ত) এবং কষালো (কষায়)। মুখে দিলে যে শুকনো ও আঁটসাঁট ভাব হয়, সেটাই এর কষায় রস। এই গুণই অতিরিক্ত তরল পদার্থ শুষে নিয়ে নাক গলানো বা চামড় থেকে পানি পড়া বন্ধ করে দেয়।
শিরীষের আয়ুর্বেদিক গুণাগুণ কী কী?
শিরীষের প্রধান কাজ হলো কফ ও পিত্ত দোষ শান্ত করা। এটি শরীরের তাপ কমায় এবং ফুসফুস ও ত্বকের প্রদাহ কমায়। নিচে এর বিস্তারিত ধর্ম দেওয়া হলো:
| ধর্ম | বর্ণনা |
|---|---|
| রস (Rasa) | তিক্ত (তেতো), কষায় (কষালো) |
| গুণ (Guna) | রূক্ষ (শুকনো), লঘু (হালকা) |
| বীর্য (Virya) | শীতল (ঠান্ডা) |
| বিপাক (Vipaka) | কটু (ঝাঁঝালো) |
| প্রধান কাজ | বিশঘ্ন (বিষ নাশক), শ্বাসহার (শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যায় উপকারী) |
চরক সংহিতা অনুযায়ী, শিরীষ শুধু বিষের জন্য নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও হাঁপানিতেও এটি একটি প্রধান ওষুধ। এর রূক্ষ ও শীতল গুণ শরীরের অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতা কমিয়ে স্বস্তি দেয়।
শিরীষ কীভাবে ব্যবহার করবেন?
সাধারণত শিরীষের ছাল বা পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে রাখা হয়। এই গুঁড়ো গরম দুধ বা জলের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। পোকার কামড়ে বা চামড়ে চুলকি হলে তাজা পাতা বেটে প্রলেপ দেওয়া যেতে পারে। তবে মাত্রা ঠিক রাখা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত খেলে বমি ভাব হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
শিরীষ কী কাজে লাগে?
শিরীষ মূলত বিষক্রিয়া, অ্যালার্জি এবং শ্বাসকষ্টের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এটি রক্ত থেকে বিষাক্ত পদarth বের করে দেয় এবং কফ দোষ শান্ত করে।
শিরীষ কীভাবে খেতে হয়?
শিরীষের শুকনো ছাল বা পাতার গুঁড়ো (১/২ থেকে ১ চামচ) গরম দুধ বা জলের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়। শুরুতে কম মাত্রায় নিয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শিরীষ কি সবাই খেতে পারে?
গর্ভবতী মা এবং খুব ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটি খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হয়। যাদের হজমে সমস্যা থাকে, তাদেরও সতর্ক থাকা উচিত।
সম্পর্কিত নিবন্ধ
তেজপাতা: কফ ও বাত দূর করে হজম শক্তি বাড়ায়
তেজপাতা শুধু মশলা নয়, এটি কফ ও বাত দূর করে হজম শক্তি বাড়ায়। আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ অনুযায়ী, নিয়মিত তেজপাতা খেলে গায়ে ব্যথা ও কফ দ্রুত কমে।
2 মিনিট পড়ার সময়
চাভ্য (Chavya): হজম শক্তি বাড়াতে এবং বাত-কফ ভারসাম্য রক্ষায় প্রাচীন ঔষধ
চাভ্য বা পিপুলমূল হলো হজমের আগুন জ্বালানোর প্রাচীন ঔষধ যা বাত ও কফ দূর করে। চরক সংহিতা অনুযায়ী, এটি শরীরের জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থ গলিয়ে দেয় এবং শীতকালে পেটের সমস্যার জন্য অত্যন্ত উপকারী।
2 মিনিট পড়ার সময়
আমলকী: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বাত সমতায় প্রাচীন আয়ুর্বেদিক উপায়
আমলকী হলো আয়ুর্বেদের সেরা ত্রিদোষ নাশক ফল, যা প্রতি সার্ভিংয়ে কমলার চেয়ে ২০ গুণ বেশি ভিটামিন সি ধারণ করে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং চরক সंहিতা অনুযায়ী শরীরের সব দোষের ভারসাম্য রক্ষা করে।
2 মিনিট পড়ার সময়
মহামঞ্জিষ্ঠাদি: রক্তশোধক শক্তি এবং ত্বকারোগ নিরাময়ে প্রাচীন সমাধান
মহামঞ্জিষ্ঠাদি হল আয়ুর্বেদের একটি শক্তিশালী রক্তশোধক ঔষধ যা মঞ্জিষ্ঠা মূল থেকে তৈরি। এটি রক্ত পরিষ্কার করে, পিত্ত দোষ কমায় এবং ব্রণ, দাগ ও এক্জিমার মতো ত্বকারোগ দ্রুত নিরাময় করে।
3 মিনিট পড়ার সময়
কaranja (কaranja): কফ দোষ, ত্বচা রোগ ও ওজন কমাতে প্রাকৃতিক সমাধান
কaranja বা পিঙ্গল ত্বচা রোগ ও কফজনিত ওজন কমাতে আয়ুর্বেদের একটি শক্তিশালী ওষুধ। চরক সংহিতায় একে 'চরক লাহা' বা ত্বচা রোগ নাশক বলা হয়েছে, যা রক্ত পরিষ্কার করে এবং টিস্যু থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়।
2 মিনিট পড়ার সময়
টাক বা দারুচিনি: সর্দি, প্রদাহ ও মেটাবলিজম বাড়াতে প্রাকৃতিক সমাধান
দারুচিনি বা টাক হলো কফ ও বাত দোষ কমানোর একটি প্রাচীন ও কার্যকর উপায়, যা শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। আয়ুর্বেদিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত খেলে কোলেস্টেরল ১৫% কমে।
3 মিনিট পড়ার সময়
তথ্যসূত্র ও উৎস
এই নিবন্ধটি চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা এবং অষ্টাঙ্গ হৃদয়ের মতো প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থের নীতির উপর ভিত্তি করে। নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য যোগ্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- • Charaka Samhita (चरक संहिता)
- • Sushruta Samhita (सुश्रुत संहिता)
- • Ashtanga Hridaya (अष्टांग हृदय)
এই নিবন্ধে কোনো ভুল পেয়েছেন? আমাদের জানান