সেভা বা মটরশুঁটির উপকারিতা
আয়ুর্বেদিক ভেষজ
সেভা বা মটরশুঁটির উপকারিতা: ত্বকা ও হজমের জন্য প্রাকৃতিক শীতলতা
বিশেষজ্ঞ পর্যালোচিত
AyurvedicUpchar সম্পাদকীয় দল দ্বারা পর্যালোচিত
সেভা কী এবং এটি কেন বিশেষ?
সেভা, যা বাংলায় আমরা সাধারণত মটরশুঁটি বা সেভা নামে চিনি, এটি একটি সাধারণ সবজি যেটি শরীরকে ঠান্ডা রাখে। তবে এর হালকা এবং শুকনো প্রকৃতির কারণে এটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে Vata দোষ বাড়াতে পারে। আয়ুর্বেদিক দ্রব্যগুণ শাস্ত্রে সেভাকে 'শীতল বির্য' বা ঠান্ডা শক্তির উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়, যার প্রধান স্বাদ মিষ্টি (মধুর) এবং একটু শুকিয়ে ফেলে এমন (কষায়)। চরক সংহিতা এবং ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টের মতো প্রাচীন গ্রন্থে ত্বকারোগ এবং রক্তশুদ্ধির জন্য এই সবজিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেভা খেলে এর মিষ্টি স্বাদ আমাদের শরীরের টিস্যুগুলোকে পুষ্টি দেয় এবং মনকে শান্ত করে, আবার কষায় স্বাদ ক্ষতবিক্ষত জায়গা সারিয়ে তোলার এবং রক্তপাত রোধ করতে সাহায্য করে। আয়ুর্বেদে স্বাদ কেবল জিহ্বায় অনুভূত একটি বিষয় নয়; প্রতিটি স্বাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ এবং দোষের ওপর নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত প্রভাব রয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অনেক সময় দেখা যায় না: সেভার কষায় বা টানানো গুণ এটিকে ত্বক জ্বালাপোড়া বা খুসকির জন্য একটি প্রাকৃতিক 'শুকানো' ঔষধ বানিয়ে দেয়, যা অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে নেয়।
সেভার আয়ুর্বেদিক গুণাবলি কী কী?
সেভা শরীরে কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য এর পাঁচটি মৌলিক গুণ জানা জরুরি। এই গুণগুলো নির্ধারণ করে কেন এটি হজমের পরেও মিষ্টি প্রভাব ফেলে এবং কেন গ্রীষ্মকালে এটি খাওয়া উপকারী।
| গুণ (সংস্কৃত) | মান | শরীরে প্রভাব |
|---|---|---|
| রস (স্বাদ) | মধুর, কষায় | শরীরকে পুষ্ট করে এবং রক্ত শুদ্ধ করে |
| গুণ (ধর্ম) | লঘু, রুক্ষ | হজম হালকা করে কিন্তু Vata বাড়াতে পারে |
| বীর্য (শক্তি) | শীতল | শরীরের তাপমাত্রা কমায় এবং পিত্ত দমিয়ে রাখে |
| বিপাক (পরিণাম) | মধুর | হজমের পরেও শরীরকে শীতল ও পুষ্ট রাখে |
| প্রভাব | পিত্ত ও কফ নাশক | ত্বকারোগ, জ্বর এবং রক্তের দোষ দূর করে |
সেভা কীভাবে ত্বকারোগে সাহায্য করে?
সেভা ত্বকারোগের ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ঘরোয়া প্রতিকার। এর কষায় গুণের কারণে এটি ত্বকের অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে এবং জ্বালাপোড়া কমায়। গ্রাম্য চিকিৎসায় প্রায়শই সেভার ডাল বা বীজের গুঁড়ো পানি দিয়ে পেস্ট করে ত্বকের চাকা বা র্যাশের ওপর লাগানো হয়।
একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য: সেভা শুধু খাদ্যই নয়, এটি আয়ুর্বেদে একটি 'বল্য' বা শক্তিবর্ধক হিসেবেও কাজ করে, যা পিত্ত এবং কফ দোষের অসাম্য দূর করে ত্বককে পরিষ্কার রাখে।
সেভা খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?
সেভা সাধারণত স্টু, সাবজি বা ডাল হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, Vata দোষ বেশি থাকলে এটি তেল বা ঘি দিয়ে রান্না করে খাওয়া উচিত, যাতে এর শুকনো প্রকৃতি প্রশমিত হয়। শীতকালে খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি শরীরকে আরও ঠান্ডা করতে পারে।
সেভা খাওয়ার সময় কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?
যাদের শরীরে Vata দোষ প্রবল, যাদের হাড়ের ব্যথা আছে বা যারা অতিরিক্ত শীতলতা অনুভব করেন, তাদের সেভা খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। এটি খাওয়ার সময় লবণ বা মশলার পরিমাণ কম রাখা ভালো, যাতে এটি হজমে সহায়ক হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সেভা খাওয়ার আয়ুর্বেদিক উপকারিতা কী?
সেভা মূলত পিত্ত এবং কফ দোষ প্রশমিত করে এবং ত্বকারোগে সাহায্য করে। এটি শরীরকে ঠান্ডা রাখে এবং রক্ত শুদ্ধ করতে ভূমিকা রাখে।
কেউ সেভা খেতে পারবে না?
যাদের Vata দোষ বেশি বা শরীর খুব ঠান্ডা, তাদের সেভা খাওয়া উচিত নয়। এটি তাদের শরীরে আরও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
সেভা কীভাবে ত্বকারোগে কাজ করে?
সেভার কষায় গুণ ত্বকের অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে এবং জ্বালাপোড়া কমায়। এটি ত্বকের র্যাশ বা চাকা সারানোর জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিকার।
সেভা খাওয়ার সঠিক সময় কখন?
গ্রীষ্মকালে সেভা খাওয়া সবচেয়ে উপকারী, কারণ এটি শরীর ঠান্ডা রাখে। শীতকালে এটি খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
সম্পর্কিত নিবন্ধ
সুরন (হাতি পাঁচু): বواسির, হজম এবং বাত দোষের জন্য আয়ুর্বেদিক উপকারিতা
সুরন বা হাতি পাঁচু হলো বসর (পাইলস) এবং ধীর হজমের জন্য একটি শক্তিশালী আয়ুর্বেদিক মূল। এটি 'যোগবাহী' হিসেবে কাজ করে যা অন্যান্য ঔষধের কার্যকারিতা বাড়ায়, তবে সঠিক পদ্ধতিতে রান্না না করলে গলায় জ্বালাপোড়া করতে পারে।
2 মিনিট পড়ার সময়
ত্রিফলা গুগগুলু: বাত, জয়েন্টের ব্যথা এবং ওজন কমানোর ঘরোয়া সমাধান
ত্রিফলা গুগগুলু হলো আয়ুর্বেদিক একটি প্রাচীন ঔষধ যা জয়েন্টের ব্যথা, বাত এবং অতিরিক্ত ওজন কমাতে বিশেষ কার্যকর। এটি কেবল অন্ত্র পরিষ্কার করে না, বরং গুগগুলুর উষ্ণতা চর্বি কোষ এবং প্রদাহগ্রস্ত জয়েন্টের ভেতরে প্রবেশ করে বিষাক্ত বর্জ্য বের করে দেয়।
3 মিনিট পড়ার সময়
হিমস্রা (Capparis sepiaria): লিভার রক্ষা ও ত্বকার স্বাস্থ্যের জন্য প্রাকৃতিক সমাধান
হিমস্রা (Capparis sepiaria) আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় লিভার রক্ষা ও রক্তশোধনের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমিয়ে ত্বকের সমস্যা ও লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করে।
2 মিনিট পড়ার সময়
সরসুরার (রাই) উপকারিতা: হজম শক্তি বাড়াতে এবং কফ দূর করতে প্রাকৃতিক সমাধান
রাই বা সরসুরা হলো একটি তীক্ষ্ণ গুণের বীজ যা হজমের আগুন জ্বালিয়ে কফ দূর করে। চরক সंहিতা অনুযায়ী, এর উষ্ণ শক্তি শরীরের জমে থাকা বর্জ্য পদার্থ দ্রুত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
2 মিনিট পড়ার সময়
এলাদি বটী: কফ, কাশি ও দূর্গন্ধ মুক্তির ঘরোয়া আয়ুর্বেদিক সমাধান
এলাদি বটী হলো একটি প্রাচীন আয়ুর্বেদিক ঔষধ যা এলাচি দিয়ে তৈরি। এটি কাশি, কফ ও গলার জ্বালাপোড়া কমায় এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। চরক সংহিতায় একে শ্বাসনালী পরিষ্কারকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
3 মিনিট পড়ার সময়
সর্পগন্ধা: উচ্চ রক্তচাপ ও অতিরিক্ত চিন্তার জন্য প্রাকৃতিক সমাধান
সর্পগন্ধা হলো উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চিন্তার জন্য প্রাকৃতিক সমাধান। এই জড়িটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে কাজ করে গভীর ঘুম আনে এবং চরক সংহিতা অনুযায়ী মনকে স্থির করে।
2 মিনিট পড়ার সময়
তথ্যসূত্র ও উৎস
এই নিবন্ধটি চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা এবং অষ্টাঙ্গ হৃদয়ের মতো প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থের নীতির উপর ভিত্তি করে। নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য যোগ্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- • Charaka Samhita (चरक संहिता)
- • Sushruta Samhita (सुश्रुत संहिता)
- • Ashtanga Hridaya (अष्टांग हृदय)
এই নিবন্ধে কোনো ভুল পেয়েছেন? আমাদের জানান