
দশমূলারিষ্টের উপকারিতা: প্রসব পরবর্তী দুর্বলতা ও বাত ব্যথায় কার্যকরী ঘরোয়া সমাধান
বিশেষজ্ঞ পর্যালোচিত
AyurvedicUpchar সম্পাদকীয় দল দ্বারা পর্যালোচিত
দশমূলারিষ্ট কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
দশমূলারিষ্ট হলো দশটি মূল জাতীয় ভেষজের (দশমূল) সংমিশ্রণে তৈরি একটি গাঁজনযুক্ত টনিক, যা মূলত প্রসব পরবর্তী দুর্বলতা কাটানো এবং বাত জনিত সমস্যা দূর করতে ব্যবহৃত হয়। চরক সংহিতায় বর্ণিত অনুযায়ী, এটি শরীরের ক্ষয় রোধ করে এবং ধাতু পুষ্টিতে সাহায্য করে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে দশমূলারিষ্টকে উষ্ণ বীর্য সম্পন্ন ওষধি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার স্বাদে কষায় (কষা) এবং মধুর (মিষ্টি) ভাব বিদ্যমান। এটি প্রধানত বাত দোষ শান্ত করে, তবে অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে শরীরে তাপ বা পিত্ত দোষ বাড়তে পারে। এই ওষধির স্বাদ কেবল জিহ্বার অনুভূতি নয়; এর কষায় রস ঘা শুকাতে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধে সাহায্য করে, আর মধুর রস শরীরকে পুষ্টি জোগায় এবং মানসিক চাপ কমায়।
দশমূলারিষ্টের আয়ুর্বেদিক গুণাগুণ কেমন?
প্রতিটি ভেষজের পাঁচটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা নির্ধারণ করে তা শরীরে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। দশমূলারিষ্টের এই বৈশিষ্ট্যগুলো জানলে আপনি এটি সঠিকভাবে এবং নিরাপদে ব্যবহার করতে পারবেন:
| গুণ (সংস্কৃত) | মান | শরীরে প্রভাব |
|---|---|---|
| রস (স্বাদ) | কষায়, মধুর | ক্ষত শুকানো, রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং শরীরকে পুষ্টি ও বল প্রদান করা। |
| গুণ (ভৌত ধর্ম) | গুরু | শরীরে স্থায়িত্ব আনে এবং ক্ষয় রোধ করে, তবে হজমে ভারী হতে পারে। |
| বীর্য (শক্তি) | উষ্ণ | শরীরে তাপ সঞ্চার করে, বাত ও কফ দূর করে এবং হজমশক্তি বাড়ায়। |
| বিপাক (পরিণাম) | মধুর | হজমের পর শরীরে পুষ্টি ধরে রাখে এবং মাংসপেশি গঠনে সহায়ক হয়। |
| প্রভাব | বাতহর | বাত দোষের কারণে হওয়া ব্যথা, শূল এবং নড়াচড়ার সমস্যা দূর করে। |
দশমূলারিষ্ট কী কী রোগে উপকারী?
দশমূলারিষ্ট মূলত শরীরের দুর্বলতা দূর করতে এবং বাতের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। প্রসবের পর মায়েদের জরায়ু সংকোচন এবং দুধের উৎপাদন বাড়াতে এটি বিশেষভাবে কার্যকরী। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী কাশি, হাঁপানি এবং কোমর বা পিঠের ব্যথায়ও এটি উপশম দেয়।
আধুনিক জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত পরিশ্রম বা খাদ্যাভ্যাসের কারণে যাদের শরীরে বাত বেড়ে যায়, তাদের জন্য দশমূলারিষ্ট একটি কার্যকরী সমাধান। এটি শরীরের টিস্যু মেরামত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে যাদের শরীরে আগে থেকেই বেশি গরম থাকে বা পিত্ত দোষ প্রবল, তাদের সতর্কতার সাথে এটি সেবন করা উচিত।
দশমূলারিষ্ট খাওয়ার সঠিক নিয়ম ও মাত্রা
সাধারণত খাওয়ার পরে সমান পরিমাণে জল মিশিয়ে ১২ থেকে ২৪ মিলি (প্রায় ১ থেকে ২ চামচ) দশমূলারিষ্ট সেবন করা উচিত। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটি কুসুম গরম দুধ বা হালকা গরম জলের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
শিশু, গর্ভবতী বা বিশেষ কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মাত্রা ভিন্ন হতে পারে, তাই নিজে থেকে মাত্রা বাড়ানো উচিত নয়। ওষধিটি গুরু (ভারী) হওয়ায় হজমে সমস্যা থাকলে সকালের দিকে বা দুপুরে খাওয়াই ভালো, রাতে খেলে হজমে ভার হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
দশমূলারিষ্ট খাওয়ার নিয়ম কী?
সাধারণত খাওয়ার পর সমান পরিমাণে জল মিশিয়ে ১২-২৪ মিলি দশমূলারিষ্ট খেতে হয়। এটি কুসুম গরম দুধ বা জলের সাথে মিশিয়ে নিলে হজমে সুবিধা হয়।
দশমূলারিষ্ট কি রোজ খাওয়া যায়?
হ্যাঁ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এটি নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে। তবে শরীরে অতিরিক্ত গরম ভাব বা পিত্তের সমস্যা থাকলে বিরতি দেওয়া উচিত।
দশমূলারিষ্ট কি পুরুষরা খেতে পারে?
হ্যাঁ, পুরুষরাও বাতের ব্যথা, কোমর ব্যথা এবং সাধারণ দুর্বলতা দূর করতে দশমূলারিষ্ট সেবন করতে পারেন। এটি কেবল মহিলাদের জন্য নয়, সবার জন্যই উপকারী।
দশমূলারিষ্ট খেলে কি সাইড ইফেক্ট হয়?
নির্দিষ্ট মাত্রায় খেলে এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, তবে অতিরিক্ত খেলে শরীরে গরম বা বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে। পিত্ত প্রকৃতির মানুষের সতর্ক থাকা উচিত।
সম্পর্কিত নিবন্ধ
তেজপাতা: কফ ও বাত দূর করে হজম শক্তি বাড়ায়
তেজপাতা শুধু মশলা নয়, এটি কফ ও বাত দূর করে হজম শক্তি বাড়ায়। আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ অনুযায়ী, নিয়মিত তেজপাতা খেলে গায়ে ব্যথা ও কফ দ্রুত কমে।
2 মিনিট পড়ার সময়
চাভ্য (Chavya): হজম শক্তি বাড়াতে এবং বাত-কফ ভারসাম্য রক্ষায় প্রাচীন ঔষধ
চাভ্য বা পিপুলমূল হলো হজমের আগুন জ্বালানোর প্রাচীন ঔষধ যা বাত ও কফ দূর করে। চরক সংহিতা অনুযায়ী, এটি শরীরের জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থ গলিয়ে দেয় এবং শীতকালে পেটের সমস্যার জন্য অত্যন্ত উপকারী।
2 মিনিট পড়ার সময়
আমলকী: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বাত সমতায় প্রাচীন আয়ুর্বেদিক উপায়
আমলকী হলো আয়ুর্বেদের সেরা ত্রিদোষ নাশক ফল, যা প্রতি সার্ভিংয়ে কমলার চেয়ে ২০ গুণ বেশি ভিটামিন সি ধারণ করে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং চরক সंहিতা অনুযায়ী শরীরের সব দোষের ভারসাম্য রক্ষা করে।
2 মিনিট পড়ার সময়
মহামঞ্জিষ্ঠাদি: রক্তশোধক শক্তি এবং ত্বকারোগ নিরাময়ে প্রাচীন সমাধান
মহামঞ্জিষ্ঠাদি হল আয়ুর্বেদের একটি শক্তিশালী রক্তশোধক ঔষধ যা মঞ্জিষ্ঠা মূল থেকে তৈরি। এটি রক্ত পরিষ্কার করে, পিত্ত দোষ কমায় এবং ব্রণ, দাগ ও এক্জিমার মতো ত্বকারোগ দ্রুত নিরাময় করে।
3 মিনিট পড়ার সময়
কaranja (কaranja): কফ দোষ, ত্বচা রোগ ও ওজন কমাতে প্রাকৃতিক সমাধান
কaranja বা পিঙ্গল ত্বচা রোগ ও কফজনিত ওজন কমাতে আয়ুর্বেদের একটি শক্তিশালী ওষুধ। চরক সংহিতায় একে 'চরক লাহা' বা ত্বচা রোগ নাশক বলা হয়েছে, যা রক্ত পরিষ্কার করে এবং টিস্যু থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়।
2 মিনিট পড়ার সময়
টাক বা দারুচিনি: সর্দি, প্রদাহ ও মেটাবলিজম বাড়াতে প্রাকৃতিক সমাধান
দারুচিনি বা টাক হলো কফ ও বাত দোষ কমানোর একটি প্রাচীন ও কার্যকর উপায়, যা শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। আয়ুর্বেদিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত খেলে কোলেস্টেরল ১৫% কমে।
3 মিনিট পড়ার সময়
তথ্যসূত্র ও উৎস
এই নিবন্ধটি চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা এবং অষ্টাঙ্গ হৃদয়ের মতো প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থের নীতির উপর ভিত্তি করে। নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য যোগ্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- • Charaka Samhita (चरक संहिता)
- • Sushruta Samhita (सुश्रुत संहिता)
- • Ashtanga Hridaya (अष्टांग हृदय)
এই নিবন্ধে কোনো ভুল পেয়েছেন? আমাদের জানান